সুদানের চলমান যুদ্ধ কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বর্ণসম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতি। ২০২৩ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া এই সংঘাতে সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্য দিতে হচ্ছে দেশটির সাধারণ মুসলমানদের।
সাবেক শাসক ওমর আল-বশিরের পতনের পর সুদানে বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) এর প্রধান হেমেদতির ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়।
এরপর থেকে দারফুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সন্ত্রাসী আরএসএফ সুদানের উত্তর দারফুর অঞ্চলে গণহত্যা চালিয়ে তিনহাজারেরও অধিক মুসলিমদের শহীদ করেছে। অত্র এলাকার প্রায় ৪ লাখেরও বেশি মানুষকে তারা অবরুদ্ধ করে রেখেছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে কোনো বিশ্ব নেতাই এ নিয়ে আলোচনা করেনি। এর প্রধান কারণ সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), যারা সন্ত্রাসী আরএসএফকে সকল ধরনের সহায়তা দিচ্ছে। তারাই বর্তমানে সমস্যাটি আন্তর্জাতিকভাবে নিরসনে বাধা দিচ্ছে।
ইসরায়েলের মদদে মধ্যপ্রাচ্য এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতিতে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে আরব আমিরাত।
তাছাড়া, সুদান আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি। পাশাপাশি সুদানের কৃষিজমি, প্রাণিসম্পদ ও লোহিত সাগরের বন্দরগুলোও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই স্বর্ণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের বাণিজ্য, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে আরএসএফকে ব্যবহার করছে আরব আমিরাত।
সুদানের যুদ্ধে আমেরিকার সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে রয়টার্সের অনুসন্ধান এবং জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের তদন্তে। সাবেক মার্কিন সেনা সদস্য ও মার্কিন সরকারের দীর্ঘদিনের ঠিকাদার স্টিভেন শাউলিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর নেটওয়ার্কে থাকা বোয়িং উড়োজাহাজ চাদ, লিবিয়া ও সুদানের বিভিন্ন রুটে চলাচল করেছে। ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই রয়টার্সের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, এসব বিমানের মাধ্যমে আরএসএফকে যোদ্ধা, বিদেশি ভাড়াটে যোদ্ধা এবং ড্রোন ও অস্ত্রসহ সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন করা হয়েছিল।
এই বিমান নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোর মার্কিন সরকারি ঠিকাদারি ইতিহাসও রয়েছে। তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অতীতে মার্কিন সামরিক ও উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করেছে এবং মার্কিন করদাতাদের অর্থে পরিচালিত বিভিন্ন চুক্তি থেকে বিপুল অর্থ পেয়েছে। ফলে সুদানের যুদ্ধক্ষেত্রে এই নেটওয়ার্কের ভূমিকা মার্কিন সংযুক্তির বিষয়টিকেও স্পষ্ট করেছে।
এই যুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মুসলিমরা। ইতিমধ্যে লাখ লাখ মুসলিম ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে এবং বহু এলাকায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।
কৃষি ও বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অসংখ্য পরিবার খাবার সংগ্রহ করতে পারছে না। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের সংকট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
সুদানের সাধারণ মুসলমানদের রক্ষা করতে হলে যুদ্ধ বন্ধ, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশ, সন্ত্রাসী আরএসএফের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের কাছে অস্ত্র ও অর্থ পৌঁছানোর নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে হবে। সেইসাথে আমিরাতের মতো যেসব দেশ পুরো পৃথিবী জুড়ে মুসলিম নির্যাতনের সাথে সংশ্লিষ্ট আছে, তাদের বিরুদ্ধে মুসলিমবিশ্বকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।