Saturday, 31 October 2026

Newsletter

দখলকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনে অভিযানের মাধ্যমে কী অর্জন করতে চাইছে ইসরায়েল?

দখলকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনে অভিযানের মাধ্যমে কী অর্জন করতে চাইছে ইসরায়েল?

পশ্চিম তীরের হেবরনে দখলদার ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে শুধু নিরাপত্তা অভিযান হিসেবে দেখলে এর ভয়াবহ বাস্তবতা আড়ালে থেকে যাবে।ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ, আবাসিক এলাকায় সামরিক অবস্থান স্থাপন, অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রে অবরোধ এবং নতুন বসতি স্থাপনের তৎপরতা, সব মিলিয়ে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের জন্মভূমিতেই ক্রমশ পরবাসীতে পরিণত হচ্ছেন।

প্রথমত, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে তাদের ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা। যে বাড়িতে একটি পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করেছে, যে উঠানে শিশুরা বড় হয়েছে, যে জমি থেকে একজন কৃষক তাঁর পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করেন, সেই বাড়ি ও জমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হলে শুধু একটি স্থাপনা হারায় না, একটি পরিবারের শিকড়ও উপড়ে যায়।

তাই হেবরনে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ এবং তাদের বাড়িঘর সামরিক অবস্থান হিসেবে ব্যবহারের ঘটনা এই আশঙ্কাকে আরও গভীর করেছে। এর ফলে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের নিজেদের এলাকায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

দ্বিতীয়ত, দখলদারিত্বকে স্থায়ী করে ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূখণ্ডেই কোণঠাসা করা। সামরিক নিয়ন্ত্রণ, চলাচলে বাধা, আবাসিক এলাকায় প্রবেশ সীমিত করা এবং বসতি সম্প্রসারণের সম্মিলিত প্রভাব ফিলিস্তিনিদের জীবনকে সংকুচিত করছে। একদিকে মানুষকে বাড়িঘর ছাড়তে হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের জমির আশপাশে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে।

এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ফিলিস্তিনিদের ভূমি ও বসতির ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। অর্থাৎ, দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেদের অধিকার রক্ষা করাই ফিলিস্তিনিদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

তৃতীয়ত, ফিলিস্তিনিদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া। হেবরন ফিলিস্তিনের শিল্প ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এই শহরের রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ হলে, কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হলে এবং ব্যবসায়ীরা পণ্য পরিবহন করতে না পারলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন হাজারো শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ পরিবার। একজন শ্রমিকের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে তাঁর সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের খাবার এবং চিকিৎসার খরচ অনিশ্চিত হয়ে পড়া।

এভাবে অবরোধের অর্থনৈতিক বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ফিলিস্তিনিদের কাঁধেই চাপে। দখলদারিত্ব শুধু তাদের ভূখণ্ড কেড়ে নেয় না; তাদের স্বাভাবিক জীবন গড়ে তোলার সক্ষমতাকেও দুর্বল করে দেয়।

চতুর্থত, ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফিলিস্তিনিদের জীবনকে বন্দি করে রাখা। যখন একজন মানুষ জানেন না, সকালে কাজে বের হতে পারবেন কি না, তাঁর সন্তান নিরাপদে স্কুলে পৌঁছাতে পারবে কি না, কিংবা রাতে নিজের বাড়িতে ফিরতে পারবেন কি না, তখন তাঁর স্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। চেকপোস্ট, অবরোধ, ধরপাকড় ও চলাচলে বিধিনিষেধ ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন জীবনকে এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। এর প্রভাব শুধু বর্তমান প্রজন্মের ওপর নয়, শিশুদের শৈশব ও ভবিষ্যৎও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পঞ্চমত, পবিত্র ইবরাহিমি মসজিদ ও ঐতিহাসিক হেবরনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও সম্প্রসারণ করা। মুসলমানদের কাছে ইবরাহিমি মসজিদ শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি গভীর ধর্মীয় তাৎপর্য বহনকারী ঐতিহাসিক নিদর্শন। এই মসজিদ ও আশপাশের এলাকার পরিকল্পনা এবং নির্মাণসংক্রান্ত ক্ষমতা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হাতে নেওয়ার উদ্যোগ ফিলিস্তিনিদের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও ধর্মীয় ঐতিহ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

তাই সামরিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনার ওপর কর্তৃত্ব বাড়লে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণও সংকুচিত হয়ে যাবে।

ষষ্ঠত, ফিলিস্তিনিদের এমন এক বাস্তবতায় ঠেলে দেওয়া, যেখানে নিজেদের ভূমিতে টিকে থাকাই হয়ে ওঠে প্রতিদিনের লড়াই। বাড়িঘর হারানোর ভয়, জীবিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, চলাচলে বাধা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সবকিছু একসঙ্গে একটি জনগোষ্ঠীর ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি করে।

এই পরিস্থিতির ফলে ফিলিস্তিনিরা বাস্তুচ্যুত হতে পারে, পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে এবং নিজেদের এলাকায় স্বাভাবিক জীবন পুনর্গঠন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এটাই হেবরনের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক।

একটি বাড়ি ধ্বংস হলে শুধু ইট-পাথর ভাঙে না; ভেঙে যায় একটি পরিবারের নিরাপত্তা, স্মৃতি ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। একটি সড়ক বন্ধ হলে শুধু যানবাহন থেমে থাকে না; থমকে যায় শ্রমিকের কর্মস্থলে যাওয়া, রোগীর হাসপাতালে পৌঁছানো এবং শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ। একটি কারখানা বন্ধ হলে শুধু উৎপাদন কমে না; বহু পরিবারের খাবার ও জীবিকার নিশ্চয়তাও হুমকির মুখে পড়ে।

সুতরাং ইসরায়েল দখলকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনে মজলুম ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান বিধিনিষেধ ও উচ্ছেদের প্রভাব তাই কোনো পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর অসহায়ত্ব, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি শিশুদের জীবন এবং নিজেদের জন্মভূমিতে অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

Related

সুদানে মুসলিম গণহত্যার নেপথ্যে কারা?

সুদানের চলমান যুদ্ধ কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বর্ণসম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতি। ২০২৩ সালের

The Relationship Between Quran and Sunnah: Understanding Revelation’s Completeness

The Quran and Sunnah form integrated revelation system—Quran as written word, Sunnah as living interpretation. Understanding their relationship prevents errors

Hadith on Prayer: Deepening Your Connection Through Prophetic Guidance

Prayer (salah) constitutes Islam’s second pillar and primary direct communication with Allah. While Quran establishes prayer obligation and basic structure,